https://ift.tt/uS5Vn7t
বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ২০২৬ সালের জুন মাস একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় চীন সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং উন্নয়ন কৌশলের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনাময় এক মাইলফলক।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা থেকে ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় বেইজিং সফর এবং সফর শেষে সম্ভাব্য যৌথ ইশতেহার ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালে। সেই সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক শিক্ষা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বাস্তবায়িত বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা বা নির্মাণ অংশীদারিত্ব রয়েছে। কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্প, রেল অবকাঠামো এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ এ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম আমদানি উৎস হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। এ কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে চীনা বাজারে অধিকতর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, কৃষিপণ্য ও তৈরি পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সম্ভাব্য ১৫টিরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা কাঠামো স্বাক্ষর। উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং ভাষা শিক্ষার মতো বহুমাত্রিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে নতুন গতি দিতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে মোংলাকে একটি আধুনিক আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে রূপান্তর করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, রপ্তানি ব্যয় কমবে এবং বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্যিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই উদ্যোগ ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য হলো টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগে যুক্ত হলে তা ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর চীনের আরেকটি বড় বৈশ্বিক উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার পথ খুলে দেবে।
বিআরআইয়ের আওতায় গত এক দশকে বাংলাদেশে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ এসেছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের চাহিদা শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। দেশ এখন প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা সহযোগিতা, উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্প এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক কারিগরি শিক্ষার মতো খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৪৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। গত দুই দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে দেশটি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশকে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বৃহৎ পরিসরের বিনিয়োগ আকর্ষণ এখন সময়ের দাবি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দেশীয় সঞ্চয় ও ব্যাংকিং খাতের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বিদেশে নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৃহৎ বাজার সেই বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এই সফরের গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়; এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ক্রমশ কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য সুবিধা এবং পশ্চিমা বিনিয়োগও দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতাও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে কোনো একটি শক্তির প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্প্রসারণ। চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক এবং দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থা ও নীতিগত সমন্বয়ও যে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে, তা এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সামার ডাভোস’ বা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি উচ্চ সুদের হার, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
তবে যেকোনো উন্নয়ন অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতাও প্রয়োজন। উন্নয়ন সহযোগিতা যেন ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি না করে, প্রকল্পগুলো যেন অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয় এবং দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে—সেদিকে নীতিনির্ধারকদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে প্রতিটি বড় চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
পাঁচ দশকের পথচলার পর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আজ নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর সফল হলে তা শুধু কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত ভারসাম্যকে সামনে রেখে পরিচালিত এই সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অভিযাত্রা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার এই নতুন সমীকরণ যদি বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফল, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং টেকসই কর্মসংস্থানে রূপ নেয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আগামী দশকের উন্নয়নযাত্রাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন দিগন্ত:
Tags
# Amarbangla Feed
# IFTTT
Share This
About News Desk
IFTTT
Tags:
Amarbangla Feed,
IFTTT
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
লেখক-এর বিবরণ
আসসালামু আলাইকুম।
আমরা আপনাদের মাঝে নিয়ে এসেছি সকল চাকরি, সরকারি নোটিশ, লেখাপড়ার খবর, প্রশ্নপত্র এবং অন্যান্য খবর সবার আগে পেতে আমাদের আমাদের সাথে থাকুন।ধন্যবাদ।
No comments:
Post a Comment